আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
গ্রামীণ সংস্কৃতিতে মেলা একটি ঐতিহ্যবাহী ‘উৎসব’। পণ্য কেনাবেচার সঙ্গে এই আয়োজন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মিলনমেলায় রূপ নেয়। কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার চিলমারী উপজেলায় সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মহাঅষ্টমী পুণ্যস্নানে পুণ্যার্থীদের ঢল নেমে। তা ঘিরে শত বছর ধরে আয়োজন হয়ে আসছে ‘অষ্টমীর মেলা’ ও ‘বালাবাড়িহাট মেলা’। এক উৎসব ঘিরে দুই মেলার আয়োজন ওই এলাকার গ্রামীণ সংস্কৃতির কয়েকশত বছরের অবিচ্ছেদ্য আয়োজন। লোকজ ঐতিহ্যে মুখরিত থাকে দুই মেলা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অষ্টমীর মেলা ঠিক কত বছর ধরে চলে আসছে তার সুনির্দিষ্ট সময় বলা কঠিন। তবে যত দিন ধরে ব্রহ্মপুত্র তীরে ঐতিহ্যবাহী অষ্টমীর স্নান হয়ে আসছে, স্নান ঘিরে অষ্টমী মেলা বসে আসছে। একসময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই মেলার আয়োজক থাকলেও কয়েক বছর ধরে উপজেলা প্রশাসন দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে মেলার আয়োজক নির্ধারণ করছে। মূলত অষ্টমী স্নানে আগত পুণ্যার্থীদের ঘিরে নানা রকম জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে ব্রহ্মপুত্র তীরে অষ্টমীর মেলা চিলমারীর ঐতিহ্য ধারণ করছে। বলা চলে অষ্টমীর স্নান উৎসবের সঙ্গে চিলমারী ও ব্রহ্মপুত্র নদের নাম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। সেই উৎসবে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে ‘অষ্টমীর মেলা’ ও ‘বালাবাড়িহাট মেলা’।
স্থানীয় শিক্ষক মিলন চন্দ্র বর্মন বলেন, ‘ কুড়িগ্রামের চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র তীরে অষ্টমীর স্নান কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলে সম্ভব নয়। তবে পূর্বপুরুষদের কাছে শুনে আসছি কয়েকশ বছর ধরে এই স্নান উৎসব হয়ে আসছে। একইসঙ্গে স্নান ঘিরে মেলার আয়োজনও হয়ে আসছে। আগে স্নান এবং মেলা দুটোর আয়োজন হিন্দু সম্প্রদায় করে আসলেও এখন মেলার নিয়ন্ত্রণ হিন্দুদের হাতে নেই। তবে স্নান উৎসব আয়োজনে স্থানীয় প্রশাসন পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করে আসছে।’
‘ব্রহ্মপু্ত্র তীরের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে অষ্টমীর মেলা বসে। স্থানীয় হস্তশিল্প, চরাঞ্চলের কৃষিপণ্য, তাঁত ও কারুপণ্যসহ নানা খেলনা ও খাবার মেলায় স্থান পায়। পুণ্যার্থী ছাড়াও সব ধর্মাবলম্বী স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে অষ্টমীর মেলা সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।’ যোগ করেন সনাতন ধর্মাবলম্বী এই শিক্ষক।
অষ্টমীর স্নান ঘিরে কয়েকশ বছর ধরে চিলমারীতে আরেকটি মেলার আয়োজন চলে আসছে। উপজেলার বালাবাড়িহাট নামক স্থানে দুই দিনব্যাপী চলা ওই মেলা স্থানীয়ভাবে ‘বালাবাড়ির হাট মেলা’ নামে পরিচিত। বালাবাড়িহাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে শুরু করে বালাবাড়ি বাজার এবং আশপাশের সড়ক ঘেঁষে চলে মেলার আয়োজন। মূলত অষ্টমীর স্নান ও অষ্টমীর মেলার পরের দিন শুরু হয়ে দুই দিনব্যাপী চলা এই মেলা স্থানীয় সব ধর্মের মানুষের কাছে ঐতিহ্যের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অষ্টমীর স্নানে আসা পুণ্যার্থীদের ঘিরে কয়েকশ বছর ধরে বালাবাড়িহাটে মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে মেলায় পুণ্যার্থীদের অংশগ্রহণের চেয়ে স্থানীদের অংশগ্রহণ বেশি। আয়োজন ঘিরে বিভিন্ন জেলায় থাকা স্থানীয় বাসিন্দা ও তাদের আত্মীয়-স্বজনরা বালাবাড়িতে বেড়াতে আসেন। মেলা ঘুরে উৎসব উপভোগ করে তারা আবার ফিরে যান।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, যুগ যুগ ধরে পুণ্যার্থীদের আগমন ঘিরে অষ্টমীর স্নানের দিন ব্রহ্মপুত্র তীরে ‘অষ্টমীর মেলা’ বসতো। স্নান উৎসবের পরের দিন বালাবাড়িহাটে বসতো বালাবাড়ি হাট মেলা। এটি ছিল দুই দিনব্যাপী। এখনও দুই দিন হয়। তবে মেলায় আগে পুণ্যার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও এখন অনেকটা কমেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনুন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা এবং রেলকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পুণ্যার্থীরা অষ্টমীর স্নানের আগেই চিলমারীতে উপস্থিত হয়ে রাত্রিযাপন করতেন। সীমিত যানবাহনের কারণে স্নান শেষে এক বা দুই দিন রাত্রিযাপন করে তারা চলে যেতেন। আগত পুণ্যার্থীরা বালাবাড়ি হাট হাই স্কুল, প্রাইমারি স্কুল, বাজার, বালাবাড়ি রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মসহ এর আশে পাশে তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান করতেন। তারা নিজেরা রান্নাবান্না করতেন। বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর আগমন ঘিরে মেলার আয়োজন হতো। স্থানীয়রাও উৎসবের আমেজে মেলায় ঘুরতে যেতেন, কেনাকাটা করতেন। দোকানিরা নানা পণ্য আর খাবারের পসরা সাজিয়ে বসতেন। বিক্রিও হতো বেশ। তবে এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে স্নান শেষে পুণ্যার্থীরা চলে যান। স্বল্প সংখ্যক পুণ্যার্থী চিলমারীতে অবস্থান করেন। ফলে কয়েক দশক ধরে মেলায় পুণ্যার্থীদের চেয়ে স্থানীয়দের উপস্থিতি বেশি দেখা যাচ্ছে।
এখনও প্রতি বছর বালবাড়িহাট মেলা ঘিরে উৎসবমুখর হয়ে উঠে পুরো এলাকা। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শিশু ও সব বয়সী নারী-পুরুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে মেলা প্রাঙ্গণ। পুরুষের পাশাপাশি নারী দোকানিদের পসরা সাজিয়ে পণ্য বেচাকেনা এই মেলায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ব্যতিক্রমী দিক হলো নববধূ ও তাদের জামাইদের অংশগ্রহণ। যুগ যুগ ধরে মেলার দ্বিতীয় দিনের সকাল নববধূ, কিশোরী ও নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। দ্বিতীয় দিন নারীরা বিশেষত নববধূ ও কিশোরীরা মেলায় গিয়ে বিভিন্ন মনোহরি ও প্রয়োজনীয় পণ্য কেনেন। নারী দোকানিদের দোকানেই ভিড় জমে বেশি। যদিও এখন সেই ধারায় কিছুটা পরিবর্তন আসছে। নারীদের পাশাপাশি যুবক ও উঠতি বয়সী তরুণ এবং শিশুরাও মেলায় ভিড় করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মেলা ঘিরে এমন কোনও জিনিস নেই যা পাওয়া যাবে না। কামার-কুমারের জিনিস, হাতের তৈরি গহনা, মাটির তৈজসপত্র, সাজের ডোগা, নকশিকাঁথা, বাঁশ ও বেতের সামগ্রীসহ নানা রকম গ্রামীণ পণ্য মেলায় স্থান পায়। এ ছাড়া শিশুদের জন্য খেলনা, নাগরদোলা এবং বাহারি খাবারের দোকান দর্শনার্থীদের উপভোগ্য করে তোলে। ব্রহ্মপুত্র নদে ধরা পড়া বড় আকারের মাছও বিক্রি হয়। চিলমারীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে অষ্টমীর মেলা ও বালাবাড়িহাট মেলা যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বালাবাড়িহাটের বাসিন্দা ও সমাজকর্মী মোঃ লুৎফর রহমান বলেন, ‘বালবাড়িহাট মেলা কত বছর ধরে চলে আসছে, তার সঠিক সময় জানা নেই। আমার বোধোদয় থেকে এই মেলা দেখে আসছি। আমার বাবা ও তার বাবার আমেলেও এই মেলা বসতো বলে শুনে আসছি। তার মানে কয়েকশত বছর ধরেই বসছে। এটি এই এলাকার মানুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।’
মেলার ঐতিহ্য উল্লেখ করে এই সমাজকর্মী বলেন, ‘এটি শুধু মেলা নয়। স্থানীয়দের কাছে পারিবারিক মিলনমেলাও। ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবের ছুটির মতো বালবাড়িহাট মেলায় অংশ নিতে বাইরে থাকা অনেকেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চিলমারীতে আসেন। বিশেষ করে নববধূ ও জামাইদের অংশগ্রহণ মেলার একটি ঐতিহ্য। তাদেরকে দাওয়াত করা স্থানীয়দের রেওয়াজ। অনেক আগে থেকেই এই প্রথা চলে আসছে।’
এ বছর ২৬ মার্চ চিলমারীর ঐতিহ্যবাহী জোরগাছ হাট এলাকায় কাছে ব্রহ্মপুত্র তীরে অষ্টমীর স্নানের সঙ্গে অষ্টমীর মেলা বসেছিল। পরদিন অর্থাৎ ২৭ ও ২৮ মার্চ বালাবাড়িহাটে দুদিনব্যাপী বালাবাড়িহাট মেলাও বসেছিল। বরাবরের মতো এ বছরও সব শ্রেণিপেশার মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশে মেলার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।